সত্য নম্বর তিন: যেখানে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার গল্প আছে, সেখানেই প্রতারক আছে। বিটকয়েন ছাড়াও হাজার হাজার ভুয়া কয়েন তৈরি হয়েছে, যেগুলোর পেছনে না আছে কোনো টেকনোলজি, না আছে কোনো আইডিয়া। সেলিব্রিটি দিয়ে হাইপ তোলা হয়, এসব কয়েনের দাম বাড়ানো হয়, তারপরে বানানোর ওয়ালারা বেচে দিয়ে পালায়। ক্রিপ্টোর নাম ভাঙিয়ে আসলে সেই পুরনো পঞ্জি স্কিম!
সত্য নম্বর চার: বর্তমানে বিটকয়েন নেটওয়ার্কের পেছনে এক বছরে বিদ্যুৎ খরচ পুরো বাংলাদেশের বার্ষিক উৎপাদনের চেয়েও বেশি! সমর্থকেরা বলে, এটাই তো নিরাপত্তার দাম। কিন্তু সমালোচকেরা বলে, পৃথিবীর মানুষ এখনো লোডশেডিংয়ের কষ্টে ভোগে, সেখানে একটা পাতায় বা খাতায় এই লেখালেখি করার জন্য এত বিদ্যুৎ পোড়ানো হইতেছে!
সত্য নম্বর পাঁচ: গতি। ভিসা বা মাস্টারকার্ডের নেটওয়ার্কে সেকেন্ডে হাজার হাজার লেনদেন হয়। বিটকয়েনের মূল নেটওয়ার্ক সেকেন্ডে মোটে এক অঙ্কের ঘরে লেনদেন সামাল দেয়। সেই ১০ মিনিটে এক পাতা লেখা হয়, মনে আছে তো? চা কিনে বিটকয়েনে চায়ের দাম দিতে গেলে চা ঠান্ডা হয়ে যাবে। সমাধানের ট্রাই করা হচ্ছে, কিন্তু দৈনন্দিন টাকা হওয়ার দৌড়ে বিটকয়েন এখনো অনেক পিছিয়ে।
এছাড়া আছে জমানো টাকার ফাঁদ। এটা সূক্ষ্ম, কিন্তু মন দিয়ে শুনুন। মনে আছে, ২ কোটি ১০ লাখের বেশি বিটকয়েন কোনোদিনই হবে না? মূল্যস্ফীতি নেই, দারুণ ব্যাপার, তাই না? কিন্তু কয়েনের এপিঠ থাকলে ওপিঠ তো আছে। পৃথিবীর অর্থনীতি প্রতিবছর বাড়তেছে, নতুন মানুষ, নতুন ব্যবসা, নতুন জিনিসপত্র আসতেছে। কিন্তু বিটকয়েনের সংখ্যা স্থির।
ধরে নিন পৃথিবীতে আর কোনো কারেন্সি নেই, খালি বিটকয়েনই আছে। তাহলে কী হবে? কিন্তু বিটকয়েনের সংখ্যা তো নির্দিষ্ট। ফলাফল: বিটকয়েনের হিসাবে সবকিছুর দাম শুধু কমতে থাকবে, আর কয়েনের দাম বাড়তে থাকবে।
এখন নিজেকে প্রশ্ন করুন, যে টাকার দাম আগামীকাল বাড়বে বলে আপনি বিশ্বাস করেন, সেটা কি আপনি আজ খরচ করবেন? করবেন না, জমিয়ে রাখবেন। লাসলোর কথা চিন্তা করুন, আজকের হিসাবে সে ওই দুটো পিজ্জা কিনতে ৬০০ মিলিয়ন ডলার খরচ করছিল, তাই না? পুরো পৃথিবী তাকে নিয়ে হাসে। আর এই হাসিটাই সমস্যা। সবাই যদি খরচের বদলে শুধু বিটকয়েন কিনে কিনে জমায়, তাহলে কেনাবেচা বন্ধ হয়ে যাবে, ব্যবসা স্থবির হয়ে যাবে, অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে।
আর একটা জিনিস খেয়াল করুন, আধুনিক অর্থনীতি চলে ঋণের উপরে। ব্যবসায়ীরা লোন নেয়, কারখানা বানায়; মানুষ লোন নেয়, বাড়ি বানায়। আর ব্যাংক যখন লোন দেয়, সে আসলে খাতায় নতুন টাকা তৈরি করে দেয়, অর্থনীতির রক্তে সঞ্চালন বাড়ে। কিন্তু বিটকয়েনে আপনার কয়েন আপনি কাউকে ধার দিতেই পারেন, কিন্তু সিস্টেমে নতুন কয়েন তৈরি করার ক্ষমতা তো আপনার নাই। দরকারের সময়ও নাই, সংকটের সময়ও নাই। এখন আপনি আপনার জমানো বিটকয়েন অন্যকে ধার কেন দেবেন? ওটা তো আপনার কাছে থাকলেই ওর ভ্যালু বাড়বে! যে কঠোরতা বিটকয়েনকে মূল্যস্ফীতি থেকে বাঁচায়, সেই একই কঠোরতা তাকে একটা চলমান অর্থনীতির রক্ত হতে দেয় না। এটাই সাতোশি নাকামোতোর ডিজাইনের সবচেয়ে গভীর ট্রেড অফ।
বিটকয়েন ছাড়াও তো হাজারো ক্রিপ্টো দেখি, এগুলো কী? খেয়াল করুন, এইমাত্র যে লিমিটেশনগুলো শুনলেন: স্লো লেনদেন, পাগলা দাম, বিদ্যুতের বিপুল খরচ, নতুন কয়েনের বেশিরভাগেরই জন্ম এই লিমিটেশনগুলোর কথা চিন্তা করে। সবচেয়ে বড় নামটি হলো ইথেরিয়াম। ২০১৫ সালে ভিটালিক বুটেরিন নামের একজন তরুণ প্রোগ্রামারের হাতে এটির জন্ম। তার আইডিয়া ছিল, ব্লকচেইনের খাতায় শুধু টাকার হিসাব কেন থাকবে? চুক্তিও তো লেখা যায়! এমন চুক্তি যেটা শর্ত পূরণ হলেই নিজেই কার্যকর হবে, কোনো উকিল-আদালত লাগবে না, স্মার্ট কন্ট্যাক্ট যাকে বলে। আবার দামের পাগলামি ঠেকাতে এসেছে স্টেবলকয়েন, যার দাম আবার মার্কিন ডলারের সাথে বাঁধা। তো তাইলে আর কী হইলো? হ্যাঁ, কিছু প্রজেক্টের পেছনে সত্যিকারেরই ইঞ্জিনিয়ারিং আছে।
তাহলে ভবিষ্যৎ কী? ক্রিপ্টো কি একদিন ব্যাংকগুলোকে পুরোপুরি রিপ্লেস করবে? সত্য উত্তর হচ্ছে, সম্ভাবনা কম। অন্তত এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ মানুষ বিটকয়েনকে দেখে টাকা হিসেবে না, ডিজিটাল গোল্ড হিসেবে। আপনি স্বর্ণ দিয়ে তো চা কেনেন না, জমি কেনেন না, রেখে দেন। বিটকয়েনও তেমন।
সাতোশির কয়েন জিতুক বা হারুক, সাতোশির আইডিয়া ইতিমধ্যে জিতে গেছে। আজ গোটা পৃথিবীতে ব্লকচেইন নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, খোদ সেন্ট্রাল ব্যাংকগুলো নিজেদের ডিজিটাল কারেন্সি বানাচ্ছে। যে মাতব্বরের বিরুদ্ধে মেশিনটি বানানো হয়েছিল, সেই মাতব্বররাই আজ সাতোশির ডিজাইন কপি করতেছে।
সবার শেষে বলি সেই সাতোশি নাকামোতোর কথা। ২০১০ এর ডিসেম্বর পর্যন্ত সে নিয়মিত কোড লিখেছে, ফোরামে উত্তর দিয়েছে। তারপর ধীরে ধীরে নীরবতা। ২০১১ সালের এপ্রিলে শেষবারের মতো ইমেইলে এক ডেভেলপারকে সে জানিয়েছিল যে, সে এখন অন্য কাজে ব্যস্ত। এরপর আর কোনোদিন কিছু না, কোনো ইন্টারভিউ না, কোনো দাবি না, কোনো বিজয় মিছিল না, কোনো র্যালি না। তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তার ওয়ালেটে ১১ লাখ বিটকয়েন আজও জমে আছে, আজকের দামে যা প্রায় ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সে কিন্তু এগুলো টাচও করেনি, খরচও করেনি।
ইতিহাসের প্রতিটি বিপ্লবীর একটা মুখ থাকে: আমাকে দেখো, স্বীকৃতি দাও, ইতিহাসে আমাকে স্থান দাও টাইপের বিষয় থাকে। আর এই লোকটা টাকার সংজ্ঞা চেঞ্জ করে দিছে, অথচ নিজে আলো নিভিয়ে চুপচাপ বেরিয়ে গেছে। হয়তো সে জানতো, তার মুখটাই সিস্টেমের শেষ দুর্বলতা। মনে আছে, সেই ই-গোল্ডের ঠিকানা ছিল বলেই দরজায় কড়া নাড়ছিল? সাতোশি নিজেকেই নিজে মুছে দিয়ে শেষ দরজাটাও বন্ধ করে দিয়েছে। সিস্টেমটা এখন সত্যিই কারোর না।
বিটকয়েনের শেষমেশ কী হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে সময়। কিন্তু একটা জিনিস প্রমাণ হয়ে গেছে, মাতব্বর ছাড়াও খাতা রাখা সম্ভব। আর এই এক প্রমাণই ব্যাংক, সরকার এবং টাকার ৫০০ বছরের খেলাটা চিরদিনের জন্য চেঞ্জ করে দিছে।
Notes
[1] - গতকাল রাত ২ টা সময় ইউটিউবে
এই্ ভিডিওটি আমার সামনে আসে। ৪৫ মিনিটের এই ভিডিও থেকে, ৫ সেকেন্ডের জন্য আমি চোখ সড়াতে পারিনি। বিগিনারদের জন্য, ইভেন অনেক এক্সপেরিয়েন্সড লোকেদের ও এই ভিডিওটি দেখা উচিৎ। এই মূল পোষ্টটি এই ভিডিও থেকেই বাংলায় লেখা হয়েছে।
[2] - আমার লেখা মডিফাই করে শেষ হওয়ার পর খেয়াল করলাম - অন্য একজন তার ওয়েবসাইটে এটা আর্টিকেল আকারে পোষ্ট করেছে। যদিও সে ভিডিওর কথা উল্লেখ করেনি। চাইলে
সেখানেও চেক করতে পারেন।